পশ্চিমবঙ্গ আবহাওয়ার খবর: ৮ জানুয়ারি, ২০২৬—উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের জেলাভিত্তিক বিস্তারিত পূর্বাভাস
৮ জানুয়ারি, ২০২৬: রাজ্যজুড়ে তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশার সতর্কতা
বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬। শীতের মরসুমের প্রায় মাঝামাঝি সময়ে এসে পশ্চিমবঙ্গ জুড়েই জাঁকিয়ে বসেছে শীত। বিগত কয়েকদিনের তুলনায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পারদ আরও নিম্নমুখী হয়েছে। পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাব কেটে যাওয়ায় এবং শুষ্ক উত্তর-পশ্চিম বাতাসের দাপটে রাজ্যজুড়ে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে বেশ কয়েক ডিগ্রি নীচে নেমে গেছে। বিশেষত উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে কুয়াশার প্রকোপ এতটাই বেশি যে দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্যে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে চাকরি প্রার্থী এবং সাধারণ মানুষের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে ‘চাকরি সংবাদ’-এর পক্ষ থেকে আমরা রাজ্যব্যাপী জেলাভিত্তিক আবহাওয়ার বিস্তারিত পূর্বাভাস তুলে ধরছি।
রাজ্যজুড়ে আবহাওয়ার সাধারণ চিত্র
আলিপুর আবহাওয়া দফতর সূত্রে খবর, আগামী ৪৮ ঘণ্টা রাজ্যজুড়ে তাপমাত্রা কমার প্রবণতা বজায় থাকবে। এই সময়ে দক্ষিণবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘন থেকে অতি ঘন কুয়াশার কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষত, সকাল ৬টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত যানবাহন চলাচল এবং আউটডোর কার্যকলাপ সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
দক্ষিণবঙ্গের জেলাভিত্তিক পূর্বাভাস
দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকবে। দিনের বেলায় রোদ উঠলেও উত্তুরে হাওয়ার দাপটে শীতের তীব্রতা বজায় থাকবে। রাতের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
১. কলকাতা ও প্রেসিডেন্সি অঞ্চল (কলকাতা, হাওড়া, হুগলি)
- তাপমাত্রা: কলকাতার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২১-২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০-১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকবে।
- আবহাওয়ার প্রকৃতি: ভোরবেলা এবং সন্ধ্যার পর ঘন কুয়াশা পড়বে। দিনের বেলা পরিষ্কার আকাশ দেখা গেলেও শীতের কামড় বজায় থাকবে।
- বিশেষ সতর্কতা: যান চলাচলের সময় কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতা কম থাকায় গতি নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
২. পশ্চিমাঞ্চলের জেলাসমূহ (পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর, পশ্চিম বর্ধমান)
এই অঞ্চলটি দক্ষিণবঙ্গের শীতলতম এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। উত্তুরে হাওয়ার সরাসরি প্রভাব থাকায় এখানে শৈত্যপ্রবাহের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
- তাপমাত্রা: পুরুলিয়া এবং বাঁকুড়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে যেতে পারে ৭-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। পশ্চিম বর্ধমানেও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে থাকবে।
- শৈত্যপ্রবাহ: রাতের দিকে এই জেলাগুলিতে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনা রয়েছে। সকালে হালকা থেকে মাঝারি ঘন কুয়াশা থাকতে পারে।
- কৃষি পরামর্শ: কৃষিজমিতে রাতের বেলা শিশির বা সামান্য তুষারপাতের সম্ভাবনা থাকায় আলু, সর্ষে এবং টমেটো ফসল রক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৩. উপকূলবর্তী ও পূর্বাঞ্চলের জেলাসমূহ (উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর)
এই অঞ্চল সমুদ্রের কাছাকাছি হওয়ায় অন্যান্য জেলার তুলনায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা সামান্য বেশি থাকলেও বাতাসের আর্দ্রতা বেশি থাকবে।
- তাপমাত্রা: সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১১-১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে থাকবে।
- আবহাওয়ার প্রকৃতি: সমুদ্র উপকূলের কাছাকাছি থাকায় ভোরের দিকে ঘন কুয়াশার স্তর অনেকক্ষণ ধরে থাকতে পারে। কুয়াশার কারণে দিনের শুরুটা ধীরগতিতে হবে।
৪. মধ্য দক্ষিণবঙ্গ (নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম)
এই জেলাগুলিতেও শীতের দাপট যথেষ্ট বেশি। দিনের বেলা তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলেও সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই তীব্র ঠান্ডা অনুভূত হবে।
নদিয়া, মুর্শিদাবাদ এবং বীরভূমে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮-১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ঘোরাফেরা করবে। কুয়াশা থাকলেও পশ্চিমাঞ্চলের মতো অতটা তীব্র শৈত্যপ্রবাহের পরিস্থিতি নাও হতে পারে, তবে ঠান্ডা হাওয়ার দাপট থাকবে।
উত্তরবঙ্গের জেলাভিত্তিক পূর্বাভাস
উত্তরবঙ্গের পাঁচটি সমতল এবং দুটি পার্বত্য জেলায় আবহাওয়া অত্যন্ত প্রতিকূল থাকতে পারে। মূলত কুয়াশা এবং তীব্র ঠান্ডা জনজীবনকে প্রভাবিত করবে।
১. পার্বত্য অঞ্চল (দার্জিলিং ও কালিম্পং)
- দার্জিলিং: সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৮ ডিগ্রি এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নামতে পারে। উঁচু স্থানগুলিতে তুষারপাতের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। পর্যটকদের অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
- কালিম্পং: সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৩-৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকবে। শীতলতম আবহাওয়া বিরাজ করবে।
২. সমতল অঞ্চল—তরাই ও ডুয়ার্স (জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার)
এই জেলাগুলি ঘন কুয়াশার কারণে রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবে। দৃশ্যমানতা নেমে যাওয়ায় ট্রেন ও বিমান চলাচলে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।
- তাপমাত্রা: সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮-১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে থাকবে। তবে কুয়াশা এবং আর্দ্রতার কারণে অনুভূত তাপমাত্রা (Chill Factor) এর থেকেও কম মনে হবে।
- কুয়াশার তীব্রতা: জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার এলাকায় ভোর ৪টা থেকে সকাল ১১টা পর্যন্ত অতি ঘন কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতা ৫০ মিটার বা তারও কম হতে পারে।
- সতর্কতা: হাইওয়েগুলিতে খুব ধীর গতিতে গাড়ি চালানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনকে কুয়াশার কারণে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করতে প্রস্তুত থাকতে হবে।
৩. নীচের দিকের উত্তরবঙ্গ (উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা)
এই জেলাগুলিতেও শৈত্যের দাপট প্রবল। উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদার প্রধান সমস্যা হল, ঘন কুয়াশা বেলা বাড়লেও সহজে কাটতে চায় না।
- তাপমাত্রা: সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯-১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকবে।
- আবহাওয়ার প্রভাব: দিনের অধিকাংশ সময় আকাশ মেঘলা থাকার কারণে সূর্যের তেজ খুব কম থাকবে, ফলে দিনের বেলায়ও ঠান্ডা অনুভূত হবে।
জেলাভিত্তিক আবহাওয়ার সংক্ষিপ্ত সারণী (৮ জানুয়ারি, ২০২৬)
| অঞ্চল | জেলা | সর্বোচ্চ তাপমাত্রা (°C) | সর্বনিম্ন তাপমাত্রা (°C) | আবহাওয়ার বিশেষ অবস্থা |
|---|---|---|---|---|
| দক্ষিণবঙ্গ | কলকাতা | ২২ | ১১ | সকাল-সন্ধ্যায় ঘন কুয়াশা |
| দক্ষিণবঙ্গ | পুরুলিয়া | ২০ | ৭ | তীব্র শৈত্যপ্রবাহের সতর্কতা |
| দক্ষিণবঙ্গ | মুর্শিদাবাদ | ২২ | ৯ | ঠান্ডা ও মাঝারি কুয়াশা |
| উত্তরবঙ্গ | দার্জিলিং | ৮ | ১ | তীব্র ঠান্ডা, তুষারপাতের সম্ভাবনা (উচ্চতা অনুযায়ী) |
| উত্তরবঙ্গ | জলপাইগুড়ি | ১৮ | ৯ | অতি ঘন কুয়াশা, দৃশ্যমানতা হ্রাস |
| উত্তরবঙ্গ | মালদা | ২১ | ১০ | ঘন কুয়াশা, দিনের বেলায় ঠান্ডা ভাব বজায় |
চাকরি সংবাদের পক্ষ থেকে সতর্কতা ও পরামর্শ
এই তীব্র ঠান্ডা এবং কুয়াশার পরিস্থিতিতে সকল পাঠক এবং চাকরি প্রার্থীদের প্রতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:
১. স্বাস্থ্যগত সতর্কতা
- আবশ্যিক গরম পোশাক পরিধান করুন, বিশেষ করে ভোরবেলা এবং সন্ধ্যায় যখন তাপমাত্রা সবচেয়ে কম থাকে।
- হৃদরোগী এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে খুব ভোরে বাইরে বের হওয়া এড়িয়ে চলুন।
- ঠান্ডা লাগা বা ফ্লু-এর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
২. যান চলাচলে সতর্কতা
ঘন কুয়াশার কারণে সড়কপথে এবং রেলপথে যাত্রা বিঘ্নিত হতে পারে।
- গাড়ি চালানোর সময় হেডলাইট ও ফগ লাইট ব্যবহার করুন।
- অতিরিক্ত গতি এড়িয়ে চলুন এবং সামনের গাড়ি থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন।
- অপ্রয়োজনীয় যাত্রা এড়িয়ে যাওয়াই শ্রেয়। যদি চাকরি বা পরীক্ষার কারণে দূরে যেতে হয়, তবে হাতে অতিরিক্ত সময় নিয়ে রওনা দিন।
৩. কৃষকদের জন্য বিশেষ পরামর্শ
শীতের ফসল রক্ষায় নিম্নোক্ত ব্যবস্থা নিন:
- জলসেচ: ফসলের জমিতে হালকা সেচ দিলে তাপমাত্রা হ্রাসের হাত থেকে ফসলকে কিছুটা বাঁচানো যেতে পারে।
- কুয়াশা: কুয়াশা পড়লে ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষত আলু, টমেটো, এবং সর্ষে ফসলকে পলিথিন বা খড় দিয়ে ঢেকে রাখার ব্যবস্থা করুন।
আমরা ‘চাকরি সংবাদ’-এর মাধ্যমে সর্বদা আপনার পাশে আছি। আবহাওয়ার এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সকলে সাবধানে ও নিরাপদে থাকুন। পরবর্তী আবহাওয়ার খবর নিয়ে আমরা আবার ফিরে আসব।
